স্বাধীবতা আন্দোলনের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক কল্পনা দত্ত...

স্বাধীবতা আন্দোলনের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক কল্পনা দত্ত...

১৯১৩ সালের ২৭ জুলাই চট্টগ্রাম জেলার শ্রীপুর অঞ্চলের বোয়ালখালি গ্রামে কল্পনা দত্ত জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বিনোদবিহারী দত্ত এবং মাতা শোভনবালা দত্ত। তাঁর ঠাকুরদা ডাক্তার দুর্গাদাস দত্ত চট্টগ্রামের একজন বিশিষ্ট ও সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছেও তাঁর যথেষ্ট মর্যাদা ছিল। সেই কারণে তাঁদের বাড়িটি দীর্ঘদিন পুলিশের নজরদারির বাইরে ছিল। ছোটবেলা থেকেই কল্পনা দত্ত ছিলেন স্বতন্ত্র মানসিকতার অধিকারী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল, ভাবপ্রবণ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাবের অধিকারী।

১৯৪০ সালে কল্পনা দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে তিনি কলকাতা ছেড়ে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। ১৯৪৩ সালে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে অসহায় ও অনাহারগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসেন। তাঁর নেতৃত্বে মহিলা সমিতি দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করে। সেই বছরই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করেন। বছরের শেষ দিকে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে তিনি চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করেন। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় তৎকালীন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক পি. সি. যোশীর সঙ্গে। পরবর্তীকালে তাঁদের বিবাহ হয়। বিবাহের পর কল্পনা দত্ত চট্টগ্রামে ফিরে এসে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ চালিয়ে যান।

১৯৪৬ সালের আইনসভার নির্বাচনে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কংগ্রেসের প্রার্থী নেলি সেনগুপ্ত। নির্বাচনে কল্পনা দত্ত বিজয়ী হতে পারেননি। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত ছিল।

১৯৪৭ সালের পর তিনি ভারতে চলে আসেন। ১৯৫০ সালে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি দিল্লিতে চলে যান এবং রুশ ও চীনা ভাষায় তাঁর দক্ষতার কারণে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ রাশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজে সম্পাদক ও শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করেন। দিল্লিতে থাকাকালীন তিনি নারী আন্দোলনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য ছিল।

কল্পনা দত্ত বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষাতেই দক্ষ ছিলেন। চল্লিশের দশকে কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘পিপলস ওয়ার’-এ তিনি নিয়মিত সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লিখতেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণকারীদের স্মৃতিকথা’ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে ‘চট্টগ্রাম অভ্যুত্থান’ নামে আরও একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তাঁর রচনাগুলি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলন ও তৎকালীন সমাজ-রাজনীতির ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গবেষকদের কাছে মূল্যবান।

মাস্টারদা সূর্য সেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় অগ্নিকন্যা এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক সাহসী নারী কল্পনা দত্ত ১৯৯৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর সংগ্রামী জীবন আজও সাহস, আদর্শ ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

শ্রীতমা সাউ

DYFI Westbengal