স্বাধীবতা আন্দোলনের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক কল্পনা দত্ত...

স্বাধীবতা আন্দোলনের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক কল্পনা দত্ত...

১৯১৩ সালের ২৭ জুলাই চট্টগ্রাম জেলার শ্রীপুর অঞ্চলের বোয়ালখালি গ্রামে কল্পনা দত্ত জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বিনোদবিহারী দত্ত এবং মাতা শোভনবালা দত্ত। তাঁর ঠাকুরদা ডাক্তার দুর্গাদাস দত্ত চট্টগ্রামের একজন বিশিষ্ট ও সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছেও তাঁর যথেষ্ট মর্যাদা ছিল। সেই কারণে তাঁদের বাড়িটি দীর্ঘদিন পুলিশের নজরদারির বাইরে ছিল। ছোটবেলা থেকেই কল্পনা দত্ত ছিলেন স্বতন্ত্র মানসিকতার অধিকারী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল, ভাবপ্রবণ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাবের অধিকারী।

১৯৪০ সালে কল্পনা দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে তিনি কলকাতা ছেড়ে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। ১৯৪৩ সালে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে অসহায় ও অনাহারগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসেন। তাঁর নেতৃত্বে মহিলা সমিতি দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করে। সেই বছরই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করেন। বছরের শেষ দিকে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে তিনি চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করেন। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় তৎকালীন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক পি. সি. যোশীর সঙ্গে। পরবর্তীকালে তাঁদের বিবাহ হয়। বিবাহের পর কল্পনা দত্ত চট্টগ্রামে ফিরে এসে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ চালিয়ে যান।

১৯৪৬ সালের আইনসভার নির্বাচনে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কংগ্রেসের প্রার্থী নেলি সেনগুপ্ত। নির্বাচনে কল্পনা দত্ত বিজয়ী হতে পারেননি। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত ছিল।

১৯৪৭ সালের পর তিনি ভারতে চলে আসেন। ১৯৫০ সালে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি দিল্লিতে চলে যান এবং রুশ ও চীনা ভাষায় তাঁর দক্ষতার কারণে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ রাশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজে সম্পাদক ও শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করেন। দিল্লিতে থাকাকালীন তিনি নারী আন্দোলনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য ছিল।

কল্পনা দত্ত বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষাতেই দক্ষ ছিলেন। চল্লিশের দশকে কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘পিপলস ওয়ার’-এ তিনি নিয়মিত সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লিখতেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণকারীদের স্মৃতিকথা’ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে ‘চট্টগ্রাম অভ্যুত্থান’ নামে আরও একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তাঁর রচনাগুলি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলন ও তৎকালীন সমাজ-রাজনীতির ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গবেষকদের কাছে মূল্যবান।

মাস্টারদা সূর্য সেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় অগ্নিকন্যা এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক সাহসী নারী কল্পনা দত্ত ১৯৯৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর সংগ্রামী জীবন আজও সাহস, আদর্শ ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

শ্রীতমা সাউ

বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্ত্রো রুজ ১০০*....

বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্ত্রো রুজ ১০০*....

'Capitalism has neither the capacity nor the morality, nor the ethics, nor the will to salve (society's) problems'....
ফিদেল কাস্ত্রো রুজ....
লাতিন আমেরিকার আকাশে মুক্তির দিশা দেখানো নেতা ফিদেল কাস্ত্রো রুজ জন্মশতবর্ষে। শত বসন্ত পেরিয়েও গোটা দুনিয়ার বিপ্লবের নেতা ফিদেল কমিউনিস্ট মতাদর্শের বিজয়ী নেতা।
মাত্র ৮২ জনকে নিয়ে সিয়েরা মায়েস্ত্রার জঙ্গল থেকে বিপ্লবের জাল বোনার শুরু। সংখ্যা টা মাত্র ৮২ ছিল শুরুতে, তারপর গোটা দুনিয়ার কাছে 'সমাজতান্ত্রিক বিকল্প'। পরে এক সংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে ফিদেল বলেছিলেন আবারও যদি বিপ্লব করতে হয় তাহলে আরও কম লোককে নিয়ে বিপ্লব শুরু করব। ফিদেল বলেছিলেন, আপনি সংখ্যায় কম হতে পারেন কিন্তু আপনার যদি মতাদর্শের প্রতি, আপনার কাজের প্রতি দৃঢ়তা থাকে তাহলে আপনি জয়ী হবেনই। ফিদেলের কিউবা মানেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উঠোন থেকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এর বিকল্প। চে ঘোষণা করেছিলেন, 'If you tremble with indignation at every injustice, then you are a Comrade of mine'...
বিপ্লবী যোদ্ধার মানুষের প্রতি ভালবাসা এমনই হয়। চে'র কথায় ' The true Revolutionary is guided by great feelings of Love'... গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ কে বার্তা দিয়ে ফিদেল বলেছেন, 'হয় সমাজতন্ত্র, নয় মৃত্যু'। চে গ্যেভারা কে হত্যা করার মূল সেনাবাহিনীর অংশ ছিলেন মারিও তেরান। পরবর্তীতে মারিও তেরানের চোখের অস্ত্রোপচার হয়েছিল ফিদেলের কিউবায়। চে-ফিদেলের দেখানো স্বপ্ন ফেরি করেই গোটা লাতিন আমেরিকা আজও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চোখে চোখ রেখে লড়াইয়ে বিকল্পের সন্ধান দিচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদের ঘুম উড়িয়ে সমাজতন্ত্রের ধ্বজা ওড়ানো বিপ্লবী দেশ কিউবা। আফ্রিকার কঙ্গো থেকে একের পর এক দেশের উপনিবেশবাদ বিরোধী স্বাধীনতার সংগ্রামে আলোকবর্তিকার ভূমিকা নিয়ে যোদ্ধাদের দ্রোহের স্পর্ধায় দিনবদলের লড়াইতে সামিল করায় নেতৃত্ব দিয়ে এসছে কিউবা। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে গোটা লাতিনে আমেরিকার দাদাগিরির বিরুদ্ধে নয়া উদারবাদ বিরোধী বিকল্পের সন্ধান দিয়েছে কিউবা। আমাদের মনে আছে দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনার বার্তা, 'আমি একজন ফিদেলের সন্তান'। হুগো সাভেজ গর্বিত কণ্ঠে নিজেকে 'ফিদেলিস্তা' হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বারবার। ১৯৫৯ সালে বিপ্লবের পর থেকেই কিউবাকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে আমেরিকা। ফিদেলকে ৬৩৮ বার খুনের চেষ্টা হয় সাম্রাজ্যবাদের মদতে। সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির চক্রান্ত কে পরাস্ত করেই ফিদেল সমাজতন্ত্রের অভিমুখে কিউবা গঠনের কাজ করে গেছেন। একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী কমিউনিস্ট হিসেবে শুধু কিউবা নয়, লাতিন কিংবা আফ্রিকার উপনিবেশবাদ বিরোধী মুক্তি আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব দেওয়া অথবা গোটা দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তির কাছে বিকল্পের দিশা দেখানোর কাণ্ডারী হিসেবেই ফিদেলকে স্মরণ করছে একবিংশ শতকের বিশ্ব। কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিপ্লবী গেরিলা যোদ্ধা যিনি একটা পিছিয়ে পড়া দেশে বিপ্লবের আদর্শকে স্থাপন করেছিলেন অবিচল দৃঢ়তা নিয়েই। ১৯৬০ সাল থেকেই আমেরিকা সহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অর্থনৈতিক অবরোধকে প্রতিহত করেই এগোতে হয়েছে কিউবাকে।১৯৬০ সাল থেকে কিউবাকে প্রায় কয়েকশো বিলিয়ন ডলার ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে কিন্তু বিপ্লবের ফলে কিউবার মানুষের যে সমষ্টিগত আত্মমর্যাদার বোধ গড়ে উঠেছে তাকে প্রতিহত করা যায়নি। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২০ সালে অবরোধ ও কোভিড পরিস্থিতির মধ্যেও কিউবা GDP’র ১১.৫% শিক্ষাখাতে খরচ করেছে। সেখানে আমেরিকা করেছে মাত্র ৫.৪%। কিউবার শিশুরা যে কোনও স্কুলে বিনামূল্যে পড়াশোনা করতে পারে। শিক্ষা কোনও পণ্য নয়, এই বিকল্পের সন্ধান দিয়েছে কিউবা। স্কুল থেকে ছাত্রদের সবাইকে খাবার দেওয়া হয়, ইউনিফর্ম দেওয়া হয়। কিউবায় চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়া যায় বিনামূল্যে, যার ফলে প্রতি ১০০০ জন কিউবাবাসীর জন্য ৮.৪% চিকিৎসক ও ৭.১% নার্স পরিষেবা দিতে পারেন। যা যে কোনও পাশ্চাত্য দুনিয়ার দেশের থেকে বহুগুণ বেশী। জনস্বাস্থ্য ব্যাবস্থার সামাজিকীকরণ করেছে কিউবা। কিউবাতে একটা পরিবারের মাসিক রেশন খরচ মাত্র ১৫০ টাকা।রেশনে সমস্ত ধরণের প্রোটিনজাত খাবার পায় কিউবার মানুষ, পরিমাণ পরিবারের সদস্য সংখয়া অনুযায়ী নির্ধারিত এবং তা ব্যাপকই বলা চলে। ফিদেলের দেখনো পথেই রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ অধিবেশনে কিউবার বিদেশ মন্ত্রী রডরিগেজ পারিলা বলেছেন, “কিউবা সরকারের কাছে সব সময় অগ্রাধিকার পেয়েছে কিউবার মানুষের স্বার্থ এবং ভবিষ্যতেও তাই হবে।“ তিনি বলেছেন, এই অবরোধ একটা ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হতে পারে কিন্তু কিউবার বিপ্লব বহু দশক ধরে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। কোনও পরিস্থিতিতেই বিপ্লব পিছু হঠবে না।

এই অবরোধের চরিত্র কতটা নির্মম হতে পারে তার সামান্য উদাহরণ দিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী রডরিগেজ পারিলা। যেমন, ফুসফুসের অসুখে রোগীদের জন্য যে ভেন্টিলেটর এবং অক্সিজেন প্রয়োজন হয় কিউবায় তার আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল মার্কিন সরকার। তখন কিউবার বিজ্ঞানী আর ইঞ্জিনীয়ররা নিজেরাই ভেন্টিলেটর বানাতে শুরু করলেন। ঠিক যেভাবে কিউবা নিজেদের জন্য কোভিড ১৯ প্রতিষেধকও বানিয়েছিল। গোটা দুনিয়ার কাছে উদাহরণ তৈরি করেছিল মহামারী এবং অর্থনৈতিক সংকট প্রতিরোধের শক্তিশালী বিকল্প হয়েই। রডরিগেজ পারিলা বলেছেন প্যান্ডেমিক পরিস্থিতিতে মার্কিন সরকার মানবিকতার খাতিরে অন্যান্য দেশগুলোকে ছাড় দিয়েছিল, কিন্তু কিউবা সেই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তিনি বলেছেন, “বাস্তবে সুযোগসন্ধানী মার্কিন সরকার তাদের কিউবাবিরোধী পরিকল্পনায় কোভিড-১৯ কে একটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।“ একটি ছোট ঘটনা মনে পড়ে কিউবার সমাজতান্ত্রিক চেতনার ব্যাপকতা বুঝতে গিয়ে। বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসব চলাকালীন কিউবায় গোটা বিশ্বের প্রতিনিধিরা যখন কিউবার মানুষের সাথে কথা বলছিলেন তখন দেখেছিলেন ৯ বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে, তার চোখে হাই পাওয়ারের চশমা, অথচ সে খাতার একদম কাছে গিয়ে খুদে অক্ষরে লিখে চলেছে তার লেখাপড়ার কাজ। প্রতিনিধিরা জিজ্ঞেস করেছিলেন তোমার চোখে এত হাই পাওয়াের চশমা তুমি এত খুদে অক্ষরে লিখছো কেন, চোখের ওপর চাপ পড়ছে তো? উত্তরে সেই ছোট কুঁড়িটি বলেছিল, আমার দেশের নেতা ফিদেল কাস্ত্রো, তাকে আমেরিকার অবরোধ পেড়িয়ে অনেক দূর থেকে কাগজ আনতে হয় আমাদের লেখাপড়ার জন্য, তাই আমাদের এত বিলাসিতার সুযোগ নেই কোনও। এই বাচ্চাটির উচ্চারণ আমাদের জানান দেয় কিউবার মানুষের মগজে সমাজতান্ত্রিক চেতনার বীজ বপন করা আছে। এই কিউবাকে কেউ হারাতে পারবে না, এই কিউবা 'অপ্রতিরোধ্য'। রাষ্ট্রসংঘের সভায় একবার কিউবার প্রতি মার্কিন অবরোধের বিরুদ্ধে ভাষণ দিয়েছিলেন ফিদেল। তাঁর সেই আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়েছিল গোটা দুনিয়ার প্রতিটা প্রান্তরে। ১৯৯১ সালে ভাঙা বার্লিন ওয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস ফুকোয়ামা ঘোষণা করেছিলেন 'End of History' (ইতিহাসের পরিসমাপ্তি)। সোভিয়েতের পতনের পর যখন বিশ্ব রাজনীতির ব্যালান্স একমেরু বিশ্বের দিকে ঝুঁকছে, সমাজতন্ত্রের আর কোনও ভবিষ্যৎ নেই বলে ঘোষণা করছেন উত্তর আধুনিকতার জনকরা, তখন একরত্তি কিউবা থেকে ফুকোয়ামার হুংকারের প্রত্যুত্তর এসছিল। ফিদেল কাস্ত্রো ঘোষণা করেছিলেন 'History is undecided and refuses to end'.... উদারনীতির আধিপত্যে বিকল্পের ভাষ্য নির্মাণে ফিদেল হয়ে উঠেছিলেন গোটা দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের নেতা। যুবদের আলোকবর্তিকা হয়েই কর্মসংস্থানের বিকল্প মডেল তৈরি করেছেন এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি সুনিশ্চিত করে, দিম বদলের বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন যুবসমাজকে। ১ কোটি ১৫ লক্ষের দেশ থেকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন সুপারপাওয়ার শক্তির আধিপত্যের বিরুদ্ধে। থেমে থাকেননি কিউবায়, যেখানেই অন্যায় সেখানেই ফিদেলের প্রতিরোধী বার্তা। ভারতে এসেছিলেন, এ দেশের কিংবদন্তি কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসুর সাথে সাক্ষাতের সমাবেশে মুখরিত হয়েছিল এই বাংলার যৌবন৷ ফিদেল বার্তা দিয়েছিলেন হার না মানা লড়াইয়ের। গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছেই ফিদেলের নাম উচ্চারিত হবে বিপ্লবের নেতা হিসেবেই। মতাদর্শে অবিচল বিপ্লবী তত্ত্বের প্রতি অগাধ আস্থা নিয়েই থিওরিকে প্র্যাকটিসে প্রয়োগের মাধ্যমে মুক্তির দিশারী হয়ে থেকে গেছেন সংকট দুঃখ ত্রাতা হয়েই। তাই সব সংকটকে মোকাবিলা করার দৃঢ়তা মিগুয়েল দিয়াজ কানেলের গলায় পাওয়া যায় কিউবার মানুষের প্রতি আস্থা থেকেই। মার্কিন অবরোধের বিরুদ্ধে এবং কিউবার প্রতি গোটা দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতিফলন। ফিদেলের কিউবা হারবে না, কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিকল্পের প্রতি সংহতিতে সমাজতন্ত্র রক্ষার প্রহরী হয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের বার্তা দেবে গোটা দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষ। সাম্রাজ্যবাদ জিতবে না, কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিকপের সংগ্রাম হারবে না। ফিদেল-চে'র কিউবা ঘুমে জাগরণে সাম্যবাদের গানে শিহরিত করবে মুক্তির আলো জ্বেলেই। ফিদেল কাস্ত্রো রুজকে দুনিয়ার মানুষ মনে রাখবে তার জন্মশতবর্ষে বিপ্লবের কমিউনিস্ট নেতা হিসেবেই।

সৈনিক শূর

E20 জ্বালানি নীতি নিয়ে সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি

E20 জ্বালানি নীতি নিয়ে সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, স্বচ্ছ প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এবং সাধারণ মানুষের মতামত গ্রহণ না করেই E20 (২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল) কার্যত বাধ্যতামূলকভাবে চালু করেছে। এর ফলে দেশের লক্ষ লক্ষ মোটরসাইকেল ও চারচাকা গাড়ির ব্যবহারকারী, বিশেষত কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং জীবিকার জন্য প্রতিদিন যানবাহনের উপর নির্ভরশীল যুবসমাজ নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।

উদ্বেগের বিষয়, এখনও দেশের রাস্তায় বিপুল সংখ্যক Non-E20 উপযোগী বা পুরনো যানবাহন চলাচল করছে। E20 জ্বালানি ব্যবহারের ফলে এই ধরনের যানবাহনের ক্ষেত্রে ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা, জ্বালানি দক্ষতা, বিভিন্ন যন্ত্রাংশের স্থায়িত্ব এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় নিয়ে গাড়ির মালিকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যেই বাড়তি খরচ, অনিশ্চয়তা এবং ভোগান্তির আশঙ্কার মুখোমুখি হয়েছেন। বিশেষ করে গিগ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত যুবক-যুবতী—যাঁরা বিভিন্ন অনলাইন সংস্থায় গাড়ি চালক হিসেবে বা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ডেলিভারি কর্মী হিসেবে প্রতিদিন নিজেদের মোটরসাইকেল বা গাড়ি ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করেন—তাঁদের উপর এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে।

আমরা আরও লক্ষ্য করছি যে, E20 নীতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের তুলনায় কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নীতিন গড়করি অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, E20 নীতি চালু হওয়ার পর তাঁর দুই ছেলে নিখিল গড়করি ও সারং গড়করি-র সঙ্গে যুক্ত CIAN Agro Industries & Infrastructure Ltd. এবং Manas Agro Industries & Infrastructure Ltd.-এর ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক মুনাফার ও আর্থিক লাভের তথ্য সামনে আসছে। এই সমস্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। E20 নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, কোন কোন সংস্থা এর প্রত্যক্ষ আর্থিক সুবিধা পেয়েছে এবং কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণের যোগসাজশ ছিল কি না—তা প্রকাশ্যে আনতে হবে। জনগণের উপর আর্থিক বোঝা চাপিয়ে কোনও কর্পোরেট বা ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মেনে নেওয়া যায় না।

অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে E20 নীতি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে কোনও পূর্বসম্মতি ছাড়াই এই পরীক্ষার অংশ করে তোলার নৈতিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি কী—এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতে হবে। কোনও সরকারের পরীক্ষানিরীক্ষার বোঝা সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। E20 ব্যাবহারে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমবে এমন কোনও নিশ্চয়তা কোনও সমীক্ষা তেই পাওয়া যায় নি। বরং কিছু ভারসাম্যগত সমস্যা বাড়তে পারে বলেই অনুমান সমীক্ষক দের।

আমরা দাবি জানাচ্ছি যে, E20 সংক্রান্ত সমস্ত বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এবং পরীক্ষার ফলাফল অবিলম্বে সর্বসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই নীতি কার্যত বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে হবে এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এই বিষয়ে আমাদের সংগঠন রাজ্যজুড়ে যুবসমাজের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার সংগঠিত করবে। পাশাপাশি, সরকার যদি এই হঠকারী সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করে এবং মানুষের ন্যায্য উদ্বেগকে উপেক্ষা করে, তাহলে ভবিষ্যতে বৃহত্তর আন্দোলন সংগঠিত হবে। জনস্বার্থবিরোধী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গণমত গড়ে তোলার জন্য সকল গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তি এবং সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।


অভিনন্দন সহ
অয়নাংশু সরকার
সভাপতি
DYFI
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি

ধ্রুবজ্যোতি সাহা
সম্পাদক
DYFI
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি

DYFI Westbengal