বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্ত্রো রুজ ১০০*....

বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্ত্রো রুজ ১০০*....

'Capitalism has neither the capacity nor the morality, nor the ethics, nor the will to salve (society's) problems'....
ফিদেল কাস্ত্রো রুজ....
লাতিন আমেরিকার আকাশে মুক্তির দিশা দেখানো নেতা ফিদেল কাস্ত্রো রুজ জন্মশতবর্ষে। শত বসন্ত পেরিয়েও গোটা দুনিয়ার বিপ্লবের নেতা ফিদেল কমিউনিস্ট মতাদর্শের বিজয়ী নেতা।
মাত্র ৮২ জনকে নিয়ে সিয়েরা মায়েস্ত্রার জঙ্গল থেকে বিপ্লবের জাল বোনার শুরু। সংখ্যা টা মাত্র ৮২ ছিল শুরুতে, তারপর গোটা দুনিয়ার কাছে 'সমাজতান্ত্রিক বিকল্প'। পরে এক সংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে ফিদেল বলেছিলেন আবারও যদি বিপ্লব করতে হয় তাহলে আরও কম লোককে নিয়ে বিপ্লব শুরু করব। ফিদেল বলেছিলেন, আপনি সংখ্যায় কম হতে পারেন কিন্তু আপনার যদি মতাদর্শের প্রতি, আপনার কাজের প্রতি দৃঢ়তা থাকে তাহলে আপনি জয়ী হবেনই। ফিদেলের কিউবা মানেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উঠোন থেকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এর বিকল্প। চে ঘোষণা করেছিলেন, 'If you tremble with indignation at every injustice, then you are a Comrade of mine'...
বিপ্লবী যোদ্ধার মানুষের প্রতি ভালবাসা এমনই হয়। চে'র কথায় ' The true Revolutionary is guided by great feelings of Love'... গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ কে বার্তা দিয়ে ফিদেল বলেছেন, 'হয় সমাজতন্ত্র, নয় মৃত্যু'। চে গ্যেভারা কে হত্যা করার মূল সেনাবাহিনীর অংশ ছিলেন মারিও তেরান। পরবর্তীতে মারিও তেরানের চোখের অস্ত্রোপচার হয়েছিল ফিদেলের কিউবায়। চে-ফিদেলের দেখানো স্বপ্ন ফেরি করেই গোটা লাতিন আমেরিকা আজও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চোখে চোখ রেখে লড়াইয়ে বিকল্পের সন্ধান দিচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদের ঘুম উড়িয়ে সমাজতন্ত্রের ধ্বজা ওড়ানো বিপ্লবী দেশ কিউবা। আফ্রিকার কঙ্গো থেকে একের পর এক দেশের উপনিবেশবাদ বিরোধী স্বাধীনতার সংগ্রামে আলোকবর্তিকার ভূমিকা নিয়ে যোদ্ধাদের দ্রোহের স্পর্ধায় দিনবদলের লড়াইতে সামিল করায় নেতৃত্ব দিয়ে এসছে কিউবা। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে গোটা লাতিনে আমেরিকার দাদাগিরির বিরুদ্ধে নয়া উদারবাদ বিরোধী বিকল্পের সন্ধান দিয়েছে কিউবা। আমাদের মনে আছে দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনার বার্তা, 'আমি একজন ফিদেলের সন্তান'। হুগো সাভেজ গর্বিত কণ্ঠে নিজেকে 'ফিদেলিস্তা' হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বারবার। ১৯৫৯ সালে বিপ্লবের পর থেকেই কিউবাকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে আমেরিকা। ফিদেলকে ৬৩৮ বার খুনের চেষ্টা হয় সাম্রাজ্যবাদের মদতে। সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির চক্রান্ত কে পরাস্ত করেই ফিদেল সমাজতন্ত্রের অভিমুখে কিউবা গঠনের কাজ করে গেছেন। একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী কমিউনিস্ট হিসেবে শুধু কিউবা নয়, লাতিন কিংবা আফ্রিকার উপনিবেশবাদ বিরোধী মুক্তি আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব দেওয়া অথবা গোটা দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তির কাছে বিকল্পের দিশা দেখানোর কাণ্ডারী হিসেবেই ফিদেলকে স্মরণ করছে একবিংশ শতকের বিশ্ব। কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিপ্লবী গেরিলা যোদ্ধা যিনি একটা পিছিয়ে পড়া দেশে বিপ্লবের আদর্শকে স্থাপন করেছিলেন অবিচল দৃঢ়তা নিয়েই। ১৯৬০ সাল থেকেই আমেরিকা সহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অর্থনৈতিক অবরোধকে প্রতিহত করেই এগোতে হয়েছে কিউবাকে।১৯৬০ সাল থেকে কিউবাকে প্রায় কয়েকশো বিলিয়ন ডলার ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে কিন্তু বিপ্লবের ফলে কিউবার মানুষের যে সমষ্টিগত আত্মমর্যাদার বোধ গড়ে উঠেছে তাকে প্রতিহত করা যায়নি। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২০ সালে অবরোধ ও কোভিড পরিস্থিতির মধ্যেও কিউবা GDP’র ১১.৫% শিক্ষাখাতে খরচ করেছে। সেখানে আমেরিকা করেছে মাত্র ৫.৪%। কিউবার শিশুরা যে কোনও স্কুলে বিনামূল্যে পড়াশোনা করতে পারে। শিক্ষা কোনও পণ্য নয়, এই বিকল্পের সন্ধান দিয়েছে কিউবা। স্কুল থেকে ছাত্রদের সবাইকে খাবার দেওয়া হয়, ইউনিফর্ম দেওয়া হয়। কিউবায় চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়া যায় বিনামূল্যে, যার ফলে প্রতি ১০০০ জন কিউবাবাসীর জন্য ৮.৪% চিকিৎসক ও ৭.১% নার্স পরিষেবা দিতে পারেন। যা যে কোনও পাশ্চাত্য দুনিয়ার দেশের থেকে বহুগুণ বেশী। জনস্বাস্থ্য ব্যাবস্থার সামাজিকীকরণ করেছে কিউবা। কিউবাতে একটা পরিবারের মাসিক রেশন খরচ মাত্র ১৫০ টাকা।রেশনে সমস্ত ধরণের প্রোটিনজাত খাবার পায় কিউবার মানুষ, পরিমাণ পরিবারের সদস্য সংখয়া অনুযায়ী নির্ধারিত এবং তা ব্যাপকই বলা চলে। ফিদেলের দেখনো পথেই রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ অধিবেশনে কিউবার বিদেশ মন্ত্রী রডরিগেজ পারিলা বলেছেন, “কিউবা সরকারের কাছে সব সময় অগ্রাধিকার পেয়েছে কিউবার মানুষের স্বার্থ এবং ভবিষ্যতেও তাই হবে।“ তিনি বলেছেন, এই অবরোধ একটা ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হতে পারে কিন্তু কিউবার বিপ্লব বহু দশক ধরে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। কোনও পরিস্থিতিতেই বিপ্লব পিছু হঠবে না।

এই অবরোধের চরিত্র কতটা নির্মম হতে পারে তার সামান্য উদাহরণ দিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী রডরিগেজ পারিলা। যেমন, ফুসফুসের অসুখে রোগীদের জন্য যে ভেন্টিলেটর এবং অক্সিজেন প্রয়োজন হয় কিউবায় তার আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল মার্কিন সরকার। তখন কিউবার বিজ্ঞানী আর ইঞ্জিনীয়ররা নিজেরাই ভেন্টিলেটর বানাতে শুরু করলেন। ঠিক যেভাবে কিউবা নিজেদের জন্য কোভিড ১৯ প্রতিষেধকও বানিয়েছিল। গোটা দুনিয়ার কাছে উদাহরণ তৈরি করেছিল মহামারী এবং অর্থনৈতিক সংকট প্রতিরোধের শক্তিশালী বিকল্প হয়েই। রডরিগেজ পারিলা বলেছেন প্যান্ডেমিক পরিস্থিতিতে মার্কিন সরকার মানবিকতার খাতিরে অন্যান্য দেশগুলোকে ছাড় দিয়েছিল, কিন্তু কিউবা সেই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তিনি বলেছেন, “বাস্তবে সুযোগসন্ধানী মার্কিন সরকার তাদের কিউবাবিরোধী পরিকল্পনায় কোভিড-১৯ কে একটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।“ একটি ছোট ঘটনা মনে পড়ে কিউবার সমাজতান্ত্রিক চেতনার ব্যাপকতা বুঝতে গিয়ে। বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসব চলাকালীন কিউবায় গোটা বিশ্বের প্রতিনিধিরা যখন কিউবার মানুষের সাথে কথা বলছিলেন তখন দেখেছিলেন ৯ বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে, তার চোখে হাই পাওয়ারের চশমা, অথচ সে খাতার একদম কাছে গিয়ে খুদে অক্ষরে লিখে চলেছে তার লেখাপড়ার কাজ। প্রতিনিধিরা জিজ্ঞেস করেছিলেন তোমার চোখে এত হাই পাওয়াের চশমা তুমি এত খুদে অক্ষরে লিখছো কেন, চোখের ওপর চাপ পড়ছে তো? উত্তরে সেই ছোট কুঁড়িটি বলেছিল, আমার দেশের নেতা ফিদেল কাস্ত্রো, তাকে আমেরিকার অবরোধ পেড়িয়ে অনেক দূর থেকে কাগজ আনতে হয় আমাদের লেখাপড়ার জন্য, তাই আমাদের এত বিলাসিতার সুযোগ নেই কোনও। এই বাচ্চাটির উচ্চারণ আমাদের জানান দেয় কিউবার মানুষের মগজে সমাজতান্ত্রিক চেতনার বীজ বপন করা আছে। এই কিউবাকে কেউ হারাতে পারবে না, এই কিউবা 'অপ্রতিরোধ্য'। রাষ্ট্রসংঘের সভায় একবার কিউবার প্রতি মার্কিন অবরোধের বিরুদ্ধে ভাষণ দিয়েছিলেন ফিদেল। তাঁর সেই আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়েছিল গোটা দুনিয়ার প্রতিটা প্রান্তরে। ১৯৯১ সালে ভাঙা বার্লিন ওয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস ফুকোয়ামা ঘোষণা করেছিলেন 'End of History' (ইতিহাসের পরিসমাপ্তি)। সোভিয়েতের পতনের পর যখন বিশ্ব রাজনীতির ব্যালান্স একমেরু বিশ্বের দিকে ঝুঁকছে, সমাজতন্ত্রের আর কোনও ভবিষ্যৎ নেই বলে ঘোষণা করছেন উত্তর আধুনিকতার জনকরা, তখন একরত্তি কিউবা থেকে ফুকোয়ামার হুংকারের প্রত্যুত্তর এসছিল। ফিদেল কাস্ত্রো ঘোষণা করেছিলেন 'History is undecided and refuses to end'.... উদারনীতির আধিপত্যে বিকল্পের ভাষ্য নির্মাণে ফিদেল হয়ে উঠেছিলেন গোটা দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের নেতা। যুবদের আলোকবর্তিকা হয়েই কর্মসংস্থানের বিকল্প মডেল তৈরি করেছেন এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি সুনিশ্চিত করে, দিম বদলের বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন যুবসমাজকে। ১ কোটি ১৫ লক্ষের দেশ থেকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন সুপারপাওয়ার শক্তির আধিপত্যের বিরুদ্ধে। থেমে থাকেননি কিউবায়, যেখানেই অন্যায় সেখানেই ফিদেলের প্রতিরোধী বার্তা। ভারতে এসেছিলেন, এ দেশের কিংবদন্তি কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসুর সাথে সাক্ষাতের সমাবেশে মুখরিত হয়েছিল এই বাংলার যৌবন৷ ফিদেল বার্তা দিয়েছিলেন হার না মানা লড়াইয়ের। গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছেই ফিদেলের নাম উচ্চারিত হবে বিপ্লবের নেতা হিসেবেই। মতাদর্শে অবিচল বিপ্লবী তত্ত্বের প্রতি অগাধ আস্থা নিয়েই থিওরিকে প্র্যাকটিসে প্রয়োগের মাধ্যমে মুক্তির দিশারী হয়ে থেকে গেছেন সংকট দুঃখ ত্রাতা হয়েই। তাই সব সংকটকে মোকাবিলা করার দৃঢ়তা মিগুয়েল দিয়াজ কানেলের গলায় পাওয়া যায় কিউবার মানুষের প্রতি আস্থা থেকেই। মার্কিন অবরোধের বিরুদ্ধে এবং কিউবার প্রতি গোটা দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতিফলন। ফিদেলের কিউবা হারবে না, কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিকল্পের প্রতি সংহতিতে সমাজতন্ত্র রক্ষার প্রহরী হয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের বার্তা দেবে গোটা দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষ। সাম্রাজ্যবাদ জিতবে না, কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিকপের সংগ্রাম হারবে না। ফিদেল-চে'র কিউবা ঘুমে জাগরণে সাম্যবাদের গানে শিহরিত করবে মুক্তির আলো জ্বেলেই। ফিদেল কাস্ত্রো রুজকে দুনিয়ার মানুষ মনে রাখবে তার জন্মশতবর্ষে বিপ্লবের কমিউনিস্ট নেতা হিসেবেই।

সৈনিক শূর

DYFI Westbengal